অতৃপ্ত ভালবাসা

 


পাঠক, আপনারা কি কখনো মানুষিক ভালোবাসার কথা শুনেছেন? আমি এরকমই একটা ভালবাসার কথা জানি। সেই গল্পটাই আজ আপনাদের কে বলতে চাই।

নাজমুল (নাম টা কাল্পনিক) বাবা মায়ের এক মাত্র ছেলে, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভাল বেতন, গাড়ি, সব ই পায়। বাবা রিটায়ার্ড সরকারি বড় কর্মকর্তা। বয়স ৩৪। অনেক দিন ধরেই পাত্রী দেখা হচ্ছে, কিন্তু ব্যাটে বলে ঠিক মত মিলছিল না।

এরই মধ্যে নাজমুল এর একটা মেয়ের ছবি দেখে বেশ পছন্দ হল।

২০০৯ এর জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ। নাহার আর নাজমুলের বিয়ে। নাজমুল পাত্রি দেখে পছন্দ করে বিয়ে করতে যাচ্ছে। নাজমুল মনে মনে ঠিক করে রেখেছে বউ কে সে এমন ভালবাসবে যে মানুষ যেন তাদের দেখে হিংসে করে।

আজ ওদের বিয়ে। কিন্তু নাজমুল রেডি হতে পারছে না। বুকের খুব গভীরে কেমন একটা চিন চিনে ব্যথা করছে।

বিয়ে টা খুব সুন্দর ভাবে সম্পন্ন হল। নাজমুল নাহার কে নিয়ে বাসায় আসলো, সাথে অনেক অনেক আত্মীয়, বন্ধু।

নাহার বাসর ঘরে বসে আছে, রাত তখন ১১.৩০ বা ১২.০০ টা। নাজমুল বাসর ঘরে আসলো। তারা সারা রাত গল্প করে সময় কাটিয়ে দিলো।

কয়েক দিন পরে তারা হানিমুন এ গেলো কক্সবাজার। নাহারের সেটাই প্রথম কক্সবাজার যাওয়া। ওদের হানিমুন টা দুজনের জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকল। কিন্তু কোন ভাবেই নাজমুলের বুকের চিন চিনে ব্যথাটা যাচ্ছে না।

এভাবেই তাদের দিন কেটে যাচ্ছিল। নাজমুল সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অফিস এর কাজে ব্যাস্ত থাকে। এর মধ্যেই নাজমুল আর নাহার বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায়, বিভিন্ন রেস্ট্রুরেন্ট এ খাওয়া দাওয়া সবই চলতে থাকে।

২০১৮ সাল, নাজমুল-নাহার এর ২ মেয়ে, ২ জন ই স্কুল এ পড়ে। পাড়া প্রতিবেশি, বন্ধু বান্ধব, সকলের কাছেই নাজমুল নাহারের পরিবার টি ভালবাসায় ভরপুর একটি আদর্শ পরিবার। নাহার এর মাঝে মাঝে নাজমুলের ভালবাসা কে মনে হয় দম বন্ধ করা ভালবাসা।

নাহার ও বুকের গভীরে একটা গর্ব অনুভব করে, নাজমুলের ভালবাসার জন্য। তার নাজমুল যে সম্পূর্ণ অন্য রকম। বেশিরভাগ ছেলেদেরই বিয়ের পরে নতুন খাতা খোলার অভ্যাস থাকে। নাজমুলের সেরকম কোন কিছু নাই। মেয়েদের প্রতি তার খুব একটা আগ্রহ দেখা যায় না।

এরই মধ্যে নাজমুল তার নীতি বিসর্জন দিতে না পারায় চাকুরী থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। সে নতুন করে তার career শুরু করে internet marketer হিসাবে।

ইতিমধ্যে দেশে করোনা কাল এসে পড়েছে। করোনায় নাজমুলের অনেক আত্মীয় স্বজনই মারা জান। এ যেন মৃত্যুর মিছিল।

২০২১ সাল, ১৫ই অগাস্ট গভীর রাত, হটাৎ ই নাজমুলের প্রচণ্ড গা ব্যাথা করে জ্বর আসে। জ্বরের মাত্রা ১০৪-১০৪.৫ ডিগ্রি। ৪ দিন প্রায় অচেতন। নাহার নাজমুলের অনেক সেবা করছে। একটু পর পর গা মুছে দেয়া, মাথা ধুয়ে দেয়া, ডাক্তারের সাথে কথা বলে ওষুধ খাওয়ানো, আল্লাহ এর বিভিন্ন দোয়া কালাম পড়ে ফু দেয়া সবই চলতে থাকল।

জ্বরের দ্বিতীয় দিন বেলা ১১ টা কি ১২ টা, নাজমুল অনেকটাই অচেতন এর মত, এর মধ্যেই নাজমুলের মনে হল একটি মেয়ে তাকে ডাকছে। মেয়েটি তার খুব পরিচিত। যার সৃতি সে গত ১৮ বছর ধরে ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। এই মেয়েটি সেই মেয়ে, যার জন্য তার বুকে চিন চিন ব্যথা হয়।

নাজমুল খুবই অবাক হয়ে যায়। সে নাহার কে ডেকে জিজ্ঞাস করে, সে এই ঘরে এসে ছিল কিনা, নাহার উত্তর দেয়, না সে আসে নি।

নাহার তার মেয়ে কে ডেকে একই কথা জিজ্ঞাস করে, মেয়েও বলে সেও আসে নি। নাজমুল খুব অবাক হয়। নাজমুল মনে মনে ঠিক করে সে এই বিষয় টা নাহারের সাথে শেয়ার করবে।

নাজমুল বিশ্বাস করে তার আর নাহারের বন্ধন খুব মজবুত, আর ১০ টা সাধারন সংসারে স্বামীর আগের ভালবাসা নিয়ে বউ এর কাছে বললে যে ধরনের reaction হয়, তা এখানে হবে না। নাহার যথেষ্ট বুঝের মেয়ে, সে হয় তো নাজমুল কে সাহায্য করতে পারবে।

১৫ দিন পরে নাজমুল মোটামুটি সুস্থ। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নাজমুল নাহার কে বলে, “আমি তোমাকে একটা গল্প বলতে চাই, একটা সত্য ঘটনা।  

এই গল্পটি জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯১ সালে।

নাজমুল ১৯৯১ সালে খিলগাঁও সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে SSC পাস করে। SSC তে তার রেসাল্ট খুব ই ভাল ছিল। নাজমুল ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন সব খেলাতেই ছিল বেস্ট। SSC র পরে Notre Dame College খুব সহজেই চাঞ্চ পেয়ে গেল।

নাজমুল খুবই আড্ডাবাজ প্রকৃতির ছেলে। শুধু একটা জায়গায় সে খুবই পিছিয়ে। সে কোন সমবয়সী বা যুবতী/কিশোরী মেয়ে এর দিকে তাকাতে পারে না। মানে একটু বেশীই লাজুক।

নাজমুল থাকতো খিলগাঁও সি ব্লক এ। একদিন কয়েক বন্ধু মিলে হাজীপাড়া যায় আড্ডা দিতে যায় একই স্কুল থেকে পাস করা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে। এই দিন টি একটি অতৃপ্ত ভালবাসার জন্ম দেয়।

সেদিন ওরা যারা হাজীপাড়ায় আড্ডা দিতে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে জুয়েল নাম এ নাজমুলের এর এক বন্ধু ছিল। যে কিনা ঐ এলাকার সুমি নাম এ একটা মেয়ে কে পছন্দ করত।

ওরা হাজীপাড়ায় একটা বাসার ছাদ এ আড্ডা দিত, যেখান থেকে সুমি ও ওদের অন্যান্য বোনদের দেখা যেত।

সেদিন নাজমুল ঐ মেয়েদের মধ্যে একজনের হাসি দেখে আর চোখ ফিরাতে পারে না। মেয়েটার হাসি ছিল সুচিত্রা সেন এর মতো। নাজমুল যেহেতু খুব লাজুক ছিল তাই সে সেই দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না।

নাজমুল সে দিন বুজতে পারল যে ঐ সুন্দর হাসির মেয়েটা এলাকার সবার ই ড্রিমগার্ল। ঐ এলাকার বন্ধুদের থেকে সে জানতে পারে মেয়েটির নাম ইভা, খিলগাঁও গার্লস স্কুল এ পড়ে।  

ইভা সুমির কাজিন। একই বিল্ডিং এ থাকে।

জুয়েল আর সুমির সম্পর্কটা একতরফা, মানে জুয়েল সুমি কে পছন্দ করে কিন্তু সুমি খুব একটা পাত্তা দেয় না।

জুয়েল প্রতিদিন বিকাল এ নাজমুল কে সাথে নিয়ে হাজীপাড়া যাওয়া শুরু করলো।

এদিকে ইভা যেহেতু অপূর্ব সুন্দরী আর নাজমুল তাদের দিকে একেবারেই তাকায় না, এটা ইভা কে নাজমুল এর প্রতি আকৃষ্ট করলো।

আস্তে আস্তে বেপারটা এমন হয়ে গেলো যে ইভা নাজমুল এর দিকে তাকিয়ে থাকতো।

এদিকে নাজমুল হাজীপাড়া যাওয়া কমিয়ে দিলো। ইভা নাজমুল কে প্রতিদিন বিকাল এ না দেখতে পেয়ে খুব হতাশ হয়ে পড়ে।

একদিন স্কুল ছুটির সময় ইভা নাজমুল কে জুয়েলদের বাসার ছাদ এ দেখে। সেই সময় আবার নাজমুল ছাদ থেকে নেমে ওদের বাসার দিকে যেতে থাকে। 

ইভা ওর বন্ধুদের সাথে আস্তে আস্তে নাজমুল এর পিছন পিছন যেতে থাকে, ওর বন্ধুরা কেউই তা বুঝতে পারে না। 

ইভা খুব ভাল করে নাজমুল এর বাসাটা চিনে নেয়।

এরপর থেকে ইভা প্রতিদিন ই নাজমুল এর বাসার সামনে দিয়ে স্কুল এ যাওয়া আসা করা শুরু করলো যা অনেকেই খেয়াল করতে লাগলো। 

ইভার আম্মু তার মেয়ের মধ্য কিছু পরিবর্তন লক্ষ করলেন। তিনি নিজেই মেয়ের স্কুল, কোচিং এ আনা নেয়া শুরু করলেন।

এদিকে নাজমুল কলেজ এর পড়ার চাপ এ বেশ বেকায়দায়, সামনেই ওর HSC পরিক্ষা। রাস্তায় যাতায়াত এ কখনো ওদের মধ্যে দেখা হলে ইভা নাজমুল এর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে যে সবাই বুঝতে পারে মেয়েটা ছেলেটা কে অসম্ভব পছন্দ করে।

নাজমুল এর বন্ধুরা সবাই বলতে থাকে মেয়েটা তোর প্রেম এ পড়েছে, তুই আগাচ্ছিস না কেন। নাজমুল আগাবে কি ভাবে, ইভা এর সাথে যখন ই দেখা হয় সাথে ওর আম্মু থাকে।

ইভার আম্মু বেশ বুঝতে পারছে যে তার মেয়ে এই ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়ায় যেতে পারে। মেয়ের প্রতি তার নজরদারি আরও বেড়ে গেলো।

এ দিকে নাজমুল এর HSC পরীক্ষা সামনে এসে গেলো, কিন্তু ও কোনভাবেই লেখাপড়ায় মন বসাতে পারছে না। ইভা কে যে ভাবেই হোক তার ভালোবাসার কথা বলতে হবে। কিন্তু ইভা কে একা পাওয়াই যায় না। সব সময় সাথে ওর আম্মু আছেই।

HSC পরীক্ষা একদম সামনে, নাজমুল এর না হচ্ছে পড়ালেখা না পারছে ইভার সাথে কথা বলতে। ইভার সাথে যা একটু রাস্তায় দেখা হতো তাও এখন হয় না। ইভা তো স্কুলে বেশ কিছু দিন ধরে যাচ্ছে না।

নাজমুল এর HSC পরীক্ষা শেষ হল। ভার্সিটি ভর্তির জন্য ও ব্যস্ত হয়ে গেলো। ইভার কথা নাজমুল এর সব সময় ই মনে হয়। কিন্তু আগের মতো দেখা হয় না। দেখা হলেও সাথে থাকে ইভার আম্মু।

হঠাৎ একদিন রাস্তায় ইভার সাথে দেখা হয় নাজমুলের। নাজমুল এর সাথে তার এক নতুন বন্ধু রাসেল ছিল। ওরা রিকশায় যাচ্ছিল। ইভার সাথে ওর ছোট বোন সেবা ছিল। ইভা নাজমুল কে দেখে খুব অভিমান নিয়ে মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেয়। তা দেখে রাসেল নাজমুল কে জিজ্ঞাস করে সে কি মেয়েটার সাথে প্রেম করে পরে ছেড়ে দিয়েছে কিনা?

নাজমুল বলে কখনো তো কথাই বললাম না, প্রেম তো দুরের কথা।

নাজমু্ল এর HSC পরীক্ষা এর রেজাল্ট বের হল। রেজাল্ট খুব একটা ভাল হল না। সে সিটি কলেজ এ ভর্তি হল।

এদিকে ইতিমধ্যে ইভা ও নাজমুলের মধ্যে এক ধরনের মানুষিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। নাজমুল যখন ই ইভা কে মনে করে তার কিছুক্ষনের মধ্যেই ইভার সাথে তার দেখা হয়। ইভার ও সেরকম হয় কিনা সেটা আমরা জানিনা।

ইভার ও SSC পরীক্ষা সামনে আসে, কিন্তু ওর ও পড়ার প্রতি খুব একটা মনোযোগ নাই। সে যে নাজমুল কে অসম্ভব ভালোবাসে, কিন্তু নাজমুলের দিক থেকে কোন সাড়া নাই, আবার মা ও খুব কড়া নজরে রেখেছে।

ইভার SSC পরীক্ষা শেষ হল, result খুব একটা ভাল হল না। সে ভর্তি হল ঢাকা মহিলা কলেজ এ। এটা ধানমণ্ডি ৭ এ।

নাজমুল একদিন জুয়েল কে জিজ্ঞাস করে ইভা কোন কলেজ এ ভর্তি হইসে জানে কি না। জুয়েল ইভা এর কলেজ ড্রেস এর বর্ণনা দেয়। নাজমুল বুঝতে পারে না। জুয়েল নাজমুল কে বলে যে ইভা কলেজ এ যায় সকাল ৬.৩০ এ।

নাজমুল আর জুয়েল একদিন ইভার পিছন পিছন ওদের কলেজ এ যায়। নাজমুল খুব অবাক হয়ে যায়। এটা তো ওদের সিটি কলেজ এর একটু পরেই। সিটি কলেজ ধানমণ্ডি ২ নাম্বার এ আর ইভার কলেজ ধানমণ্ডি ৭ নাম্বার এ।

নাজমুল মনে মনে বেশ খুশি ই হয়। এখানে হয়তো ইভার সাথে কথা বলা যাবে। কলেজ ছুটির পরে নাজমুল ইভাদের কলেজ এ যায়। প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে ইভার ছুটি হয়। নাজমুল কে দেখে ইভার চোখে একটা খুশির ঝিলিক দেখা যায়। কিন্তু নাজমুল খুব নার্ভাস হয়ে যায়, খুব একটা কিছু বলতে পারে না। সে ইভা কে সুমির কথা জিজ্ঞাস করে।

এভাবেই নাজমুল ইভার সাথে ৩-৪ দিন দেখা করে, কিন্তু এক দিন ও সে নিজের ভালবাসার কথা বলতে পারে না।

একদিন ইভা নাজমুল কে বলেই ফেলে যে তার নিজের কোন কথা থাকলে যেন বলে, আরেকজনের কথা ওর সাথে যেন আলাপ না করে। নাজমুল প্রেম এর ব্যপারে এতোটাই আনাড়ি ও অজ্ঞ ছিল যে ইভার সিগন্যাল টা সে বুঝতেই পারে নাই।

বেশ কিছুদিন পরে নাজমুল অনেক সাহস নিয়ে ইভার কলেজ এ যায় এবং ওকে সরাসরি প্রপোজ করে। ইভা নাজমুলের প্রপোজ শুনে এক দৌড় দেয়। নাজমুল মনে করে যে ইভা রাজি না, তাই সে দৌড় দিয়েছে।

পর দিন নাজমুল আবার ইভার কলেজ এ যায়, সেখানে ইভা কে না দেখে ওর মনে ধারনা আরো শক্তিশালী হয় যে ইভা নাজমুলের প্রপোজে রাজি না।

নাজমুল ইভার কলজ এ যাওয়া বন্ধ করে দেয়।

ইভা নাজমুলের দিক থাকে আর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে খুব ক্রেজি হয়ে যায়। নাজমুল কে জেলাস ফিল করানোর জন্য ইভা নাজমুলের সামনে গিয়ে অন্য ছেলেদের সাথে কথা বলা শুরু করে। এটা নাজমুল কে অনেক অনেক কষ্ট দিতে থাকে। কিন্তু নাজমুল তো ধরেই নিয়েছে ইভা তাকে ভালবাসে না।

নাজমুলের graduation শেষ হয়। সে মাস্টার্স ও I.C.M.A তে ভর্তি হয়। একদিন সে মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করে। সে সম্পূর্ণরূপে সমোরিতা হাসপাতালের এম্বুলন্সের নিচে চলে যায়। নাজমুলের মনে হয় সে হয়তো মারা যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখের সামনে ইভার মুখটা ভেসে আসে।

নাজমুল এক্সিডেন্ট থেকে সুস্থ হয়ে একদিন ইভা কে ফোন দেয়। ফোনে সে তার ভাললাগার কথা বলে। ইভা প্রথম ফোনে বেশ কনফিউসড। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে নাজমুল তাকে ফোন দিয়েছে। ১-২ দিন পরে নাজমুল আবার ইভা কে ফোন দিলে সে নাজমুলের ঠিকানা জানতে চায়। নাজমুল তার পরিচয় সম্পূর্ণ ভাবে দিলে, ইভা মোটামুটি সিওর হয় যে সে যাকে মনে মনে চায়, সেই তাকে ফোন দিয়েছে।

ইভার সাথে নাজমুলের প্রতিদিনই ফোন এ কথা হতে থাকে। কিন্তু ইভা কোন ভাবেই তার ভাললাগার কথা স্বীকার করে না।

এর মধ্যে ইভার ছোট বোন সেবার সাথে নাজমুলের ২-৩ বার কথা হয়। কথা বলার এক পর্যায় সেবা নাজমুল কে বলে ফেলে তার জন্য বাসায় ইভা কে নিয়ে অনেক কিছু হয়েছে।

একদিন নাজমুল ইভা সম্পর্কে অনেক কথা ইভা কে বলে যা ইভা ছাড়া অন্য কারো জানার কথা না। নাজমুলের মুখে এ সকল কথা শুনে ইভা একদম অন্য জগতে চলে যায় এবং এক পর্যায় ইভা স্বীকার করে নেয় যে সেও নাজমুল কে খুব পছন্দ করে।   

ইভা মাঝে মাঝে অনেক রাতে নাজমুল কে ফোন দিত, কিন্তু কোন কথা বলত না। নাজমুল বুঝতে পারত ইভাই ফোন দিয়েছে, কারন সে যখন অনেক বেশি ইভা কে মিস করত তখনই এই ফোন আসত।

নাজমুলের সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে একদিন ইভা নাজমুল কে বলে তার জন্য ইভার অনেক ক্ষতি হয়েছে, অনেক বার তাকে বাসায় আটকিয়ে রাখা হয়েছে, কয়েকবার তাকে অন্য আত্মীয় এর বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়ে ছিল। সে যেন কোন ভাবেই ভবিষ্যতে ইভা কে কষ্ট না দেয়।

নাজমুল ইভার সাথে বাইরে কথাও দেখা করতে চাইলে, ইভা বলে যে বাইরে দেখা করার কি দরকার, প্রতিদিন ই তো দেখা হচ্ছে।

ইভা ফোন এ তার বেশ কয়েকজন কাজিন এর সাথে নাজমুলের পরিচয় করিয়ে দেয়।

এরই মধ্যে ইভার ডিগ্রি পরিক্ষার এডমিট কার্ড দেয়ার দিন এসে পরে। ইভা নাজমুল কে জানায় এডমিট কার্ড দেয়া হবে সকালে। নাজমুল সকালে ওদের কলেজ এ যায়। যেয়ে সে জানতে পারে এডমিট কার্ড দেয়া হবে বিকাল এ।

নাজমুল বিকাল এ ইভার কলেজ এ উপস্থিত হয়। নাজমুলের সাথে ইভার দেখা হয়। সে ইভা কে জিজ্ঞাস করে কেন ইভা নাজমুল কে মিথ্যা কথা বলেছিল।

এই কথায় ইভা নাজমুলের উপরে বেশ রেগে যায়। ইভা বেশ কিছু দিন নাজমুলের সাথে ফোনে কথা বলা বন্ধ রাখে। কিন্তু তাদের মানুষিক যোগাযোগ ঠিকই থাকে। যখনই নাজমুল ইভার কথা চিন্তা করে তখনই হয় ইভার সাথে তার দেখা হয়।

ইভা মাঝে মাঝে রাতে নাজমুল কে ফোন দেয় কিন্তু কোন কথা বলে না, শুধু দীর্ঘশ্বাস এর আওয়াজ পাওয়া যায়।

একদিন নাজমুল ইভা কে ফোন দিলে ইভা ধরে, নাজমুল তার ব্যবহার এর জন্য ক্ষমা চায়। পরিক্ষার সিট কথায় পরসে জানতে চাইলে, ইভা বলে “বলে কি লাভ, যদি মিথ্যা হয়ে যায়”।

এভাবেই তাদের প্রেম চলতে থাকে।

ইতিমধ্যে নাজমুলের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়। পরীক্ষা শেষের সাথে সাথেই সে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ম্যনেজমেন্ট ট্রেইনি হিসাবে যোগ দেয়।

নাজমুলের পরীক্ষা শেষের সাথে সাথে যে প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পায় সেখানেই যোগ দেয়ার পিছনে একটা বড় কারন হল, সে সব সময়ই মনে করতো ইভার যে কোন সময় বিয়ে হয়ে যেতে পারে। ইভা যে অসম্ভব সুন্দরী। ৫ মাসের মাথায় নাজমুল এর চাকরীতে বেশ ভাল একটা প্রমোশন হয়। ম্যনেজমেন্ট ট্রেইনি থেকে সে একটি বড় দায়িত্ব পায়।

সে মনে করে এখন ইভার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দেয়া যায়। নাজমুল তার বন্ধু রাসেল কে ইভার বাসায় যেয়ে ওর গার্জেন এর সাথে কথা বলতে বলে। নাজমুলের পরিকল্পনা ছিল এরকম যে রাসেল ইভাদের বাসায় ওর বাবা মা কে নিয়ে যাওয়ার একটা রাস্তা তৈরি করবে।

কিন্তু রাসেল ইভাদের বাসায় যাওয়ার পরদিন ইভার মামা নাজমুলের আব্বা কে ফোন করে বেশ কটু কথা শুনায়, নাজমুলের মামার বাসায় ও ফোন করে অনেক আজেবাজে কথা বলে। নাজমুল অফিস এ, এর মধ্যে ওর আম্মা ফোন করে নাজমুল কে সব কিছু জানায়।

রাতে নাজমুলের কাছে ইভার এক রিলেটিভ এর কাছ থেকে ফোন আসে। সে নাজমুল কে বলে যে ইভার আম্মা এই বিয়ে তে রাজি না, নাজমুল যেন কোন ভাবেই এখানে আর না আগায়।

পরদিন সন্ধায় নাজমুল রাসেল কে নিয়ে ইভার মামার সাথে দেখা করতে যায়। ইভার মামা নাজমুলকে অনেক বাজে কথা বলে এবং বলে যে এখানে তারা কোন ভাবেই বিয়ে দেবে না।

এই কথা শুনে নাজমুল ইভার মামাকে বলে সে আর ইভার সাথে যোগাযোগ করবে না, ইভার যদি কখনো প্রয়োজন হয় তাহলে সে যেন যোগাযোগ করে।

এরপর নাজমুল আর কখনো ইভার সাথে যোগাযোগ করে নাই। নাজমুল বাসায় এসে অনেক কান্নাকাটি করে। ওর আম্মা ওকে অনেক সান্ত্বনা দেয় এবং বলে তুমি এক সময় ভুলে যাবা, মন খারাপ করোনা।

নাজমুল ইভাকে ভুলে থাকার জন্য অফিস এর কাজ এ অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পরে। তার চাকরীতে খুব দ্রুত প্রমোশন হতে থাকল।

সে অফিস এর কাজ এ বিভিন্ন দেশ এ যেতে থাকল। এর মধ্যেই একদিন নাজমুল জানতে পারলো ইভার বিয়ে হয়ে গেছে।

একদিন নাজমুল বাস এক্সিডেন্ট করে, ৫ জন স্পট ডেথ। নাজমুল খুব সিরিয়াসলি আহত।কয়েক মিনিট এর জন্য গ্যান হারাল। ঠিক সেই অবস্থায় তার মনে হল ইভা তাকে ডাকছে। নাজমুলের গ্যান ফিরে এলো।

এরপর থেকে নাজমুলের জীবনটা সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে গেলো। সে কাজ শেষ এ অনেক রাত করে বাসায় ফিরতে লাগলো। বিভিন্ন রকমের বদ অভ্যাস তার নিত্য সঙ্গী হল।

নাহার নাজমুলের এই ঘটনা শুনে খুব অবাক হয়ে যায়। সে বিশ্বাস করতো নাজমুলের জিবনে সেই সব। নাজমুল-নাহারের সম্পর্কটা খুব শক্তিশালী, অনেক কাপল/দম্পত্তির এর কাছেই তারা ঈর্ষার কারন।

নাহার মনে করে অনেকেরই পূর্বের কোন ঘটনা থাকতে পারে, কিন্তু সবাই সেটা ভুলে যায়, নাজমুলও হয়তো ভুলে যাবে। নাহারের ধারনা ভুল ছিল। সে খেয়াল করলো নাজমুল এর ঘুম একেবারেই হয় না। তার মনটাও অনেক বেশি খারাপ।  

নাহারের মনে একটা গর্বের জায়গা ছিল যে তার নাজমুল তাকে অনেক বেশি ভালবাসে। নাহারের মনে হল যে অপরিচিত একটি মেয়ে কে বিয়ের পরে এত ভালবাসতে পারে, তার প্রথম প্রেমের ভালবাসা অনেক বেশি গভীর হওয়াই স্বাভাবিক।

নাহার নাজমুল কে কথা দেয় যে ভাবেই হোক নাজমুল কে ইভার সাথে দেখা করায় দেবে।

ফেসবুক এর মাধ্যমে কত মানুষের মধ্যে ৩০-৪০ বছর পরেও যোগাযোগ হয়। নাজমুলের মনেও এরকম একটা আশা।

নাজমুলের মনের ইচ্ছা, সে ইভার সুখের সঙ্গী না হতে পারলেও তার যে কোন অসুবিধায় বা দুঃখের সময় যেন তার পাসে থাকতে পারে। 


মন্তব্যসমূহ